অফিস ডেস্ক
আবু ইউসুফ নওগাঁ প্রতিনিধি: নওগাঁয় সিটবিহীন টিকেটে বাসযাত্রাকে কেন্দ্র করে তর্কের জেরে এক বাসের চালককে ডেকে নিয়ে গিয়ে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে সহকারী পুলিশ সুপার শ্যামলী রানী বর্মনের বিরুদ্ধে।
রোববার (০৪ জানুয়ারী) রাত সাড়ে ১০টার দিকে সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয় সাপাহার সার্কেল অফিসে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে ওইদিন সকাল সাড়ে ৯টায় সাপাহার থেকে রাজশাহীগামী ‘হিমাচল’ পরিবহনে ধানসুরা যাবার পথে বাস চালক ও সুপারভাইজারের সাথে তর্কে জড়ান সহকারী পুলিশ সুপার শ্যামলী রানী বর্মনের স্বামী জয়ন্ত বর্মন।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, রাজশাহীগামী ‘হিমাচল’ পরিবহনের একটি বাস রোববার (০৪ জানুয়ারী) সকাল সাড়ে ৯টায় সাপাহার থেকে ছাড়ে।
রাজশাহী সড়ক পরিবহন মালিক গ্রপের ওই বাসে যাত্রী হয়ে ধানসুরা নামার উদ্দেশ্যে সিটবিহীন টিকিট কেটে উঠেছিলেন সহকারী পুলিশ সুপার (সাপাহার সার্কেল) শ্যামলী রানী বর্মনের স্বামী কলেজ শিক্ষক জয়ন্ত বর্মন।
বাসটি দিঘার মোড়ে পৌঁছালে ওই স্টপেজ থেকে রাজশাহীগামী যাত্রীর যেই সিটে জয়ন্ত বর্মন বসেছিলেন সেটি থেকে উঠে যেতে অনুরোধ করেন সুপারভাইজার সিয়াম। ওই সময়ে নিজেকে সার্কেল এসপির স্বামী পরিচয় দিয়ে সুপারভাইজারকে হুমকি দিতে শুরু করেন জয়ন্ত।
এক পর্যায়ে সৃষ্ট তর্ক বাড়তে থাকলে সিট ছেড়ে দিয়ে বাস চালক বাদলের কাছে এগিয়ে যান জয়ন্ত। চালকের সঙ্গে চলে তুমুল বাকবিতন্ডা। এরপর নির্ধারিত গন্তব্য ধানসুরায় নেমে যাওয়ার আগে চালক ও সুপারভাইজারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে চলে যান জয়ন্ত বর্মন।
এদিকে, জয়ন্ত বর্মণ গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার পর সাপাহারের টিকেট মাস্টারকে অফিসে ডেকে নেয় সহকারী পুলিশ সুপার (সাপাহার সার্কেল) শ্যামলী রানী বর্মন। টিকেট মাস্টারের ব্যবহৃত মুঠোফোন থেকে বাস চালক বাদলকে কল করেন তিনি। এরপর চালক ও সুপারভাইজারকে হুমকি ধামকি প্রদর্শন করেন শ্যামলী রানী বর্মন। যাত্রাপথে বার বার শ্যামলী রানী বর্মণের কল আসায় বাসটি নির্ধারিত সময়ে রাজশাহী পৌঁছাতে কিছুটা দেরী করে ফেলে।
পরবর্তীতে রাত ১০টায় ‘হিমাচল’ পরিবহনের ওই বাস পুনরায় সাপাহারে ফিরলে চালককে বাসস্ট্যান্ড থেকে অফিসে ডেকে আনেন শ্যামলী রানী বর্মন। সেখানে পৌঁছানোর পর তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বাস চালক বাদলের পেটে প্রথমেই সজোরে লাথি মারেন শ্যামলী রানী বর্মন। বেধড়ক পেটাতে শুরু করেন তার স্বামী জয়ন্ত বর্মনও। এরপর সহকারী পুলিশ সুপার শ্যামলী রানী বর্মনের নির্দেশে তার বডিগার্ড আনন্দ বর্মণ এসএস পাইপ দিয়ে চালককে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন। পরে আহত অবস্থ্যায় বাদল জ্ঞান হারালে সাপাহারের কোন হাসপাতালে চিকিৎসা না নেওয়ার শর্তে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে পরের দিন সোমবার (০৫ জানুয়ারি) দুপুরে রাজশাহীতে ফিরে রাজশাহী মেডিকেলে কলেজ (রামেক) হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন বাস চালক বাদল।
ভুক্তভোগী বাস চালক বাদল বর্তমানে চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় বিশ্রামে আছেন। যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে নির্যাতনের শিকার চালক বাদল বলেন, এএসপি (শ্যামলী রানী বর্মন) ম্যাডাম এবং ওনার স্বামী (জয়ন্ত বর্মন) আমাকে অফিসে ডেকে নিয়ে গিয়ে শরীরের গোপন জায়গা গুলোতে মেরেছে। উনি (শ্যামলী রানী বর্মন) বডিগার্ডকে বললেন মাইরা হাত পা ভেঙ্গে দে। তারপর বডিগার্ড আমাকে এসএস পাইপ দিয়ে উচ্ছেমতো পিটিয়েছে। আমি এর বিচার চাই। শ্রমিক বলে আমরা কি মানুষ না’?
রোববার (০৪ জানুয়ারী) সকাল সাড়ে ৯টায় ওই বাসে রাজশাহীর যাত্রী হিসেবে ছিলেন স্কুল শিক্ষক নাসির।
ওইদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি বলেন, একজন শিক্ষিত মানুষ হয়েও জয়ন্ত বর্মন যে আচরন করলেন তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সহকারী পুলিশ সুপার স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে তিনি ওই বাসের ড্রাইভারের কাগজপত্র যে ভাষায় দেখতে চাইলেন এবং হুমকি দিলেন তারীতিমতো শাস্তিযোগ্য বলে মনে হয়েছে। ফোনে এএসপি শ্যামলী রানীও অনেক হুমকি দিয়েছেন।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী রাজশাহী কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী সজীব বলেন, জয়ন্ত বর্মন স্ত্রীর ক্ষমতা দেখিয়ে খুব বাজে আচরণ করেছেন। বাসের মধ্যে মনে হচ্ছিলো উনি ড্রাইভার আর সুপারভাইজারকে মেরেই দিবেন। বারবার তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন। উনার এতো পাওয়ার তো প্রাইভেট গাড়ীতে চলবে’।
এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজশাহী সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, আমাদের বাস এক চালককে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে সার্কেল এসপি শ্যামলী রানী বর্মন নির্যাতন করার পর থেকে স্থানীয় বাস মালিক ও শ্রমিকদের মাঝে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ ঘটনার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি (শ্যামলী রানী বর্মন) আমাদের সাথেও অশোভন আচরন করেছেন। আমরা অবিলম্বে তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারসহ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থ্যা গ্রহণের দাবী জানিয়েছি। অন্যাথায় হরতালসহ কঠোর কর্মসূচীর ডাক দেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পুলিশ সুপার (সাপাহার সার্কেল) শ্যামলী রানী বর্মন বলেন, আমার হাজবেন্ডের সঙ্গে মুঠোফোনে অন কলে থাকা অবস্থ্যায় তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার বিষয়টি আমি নিজে শুনেছি। পরে ড্রাইভার এবং সুপারভাইজারকে রাতে অফিসে ডাকা হয়েছিলো।
ড্রাইভার এসে স্যরি বললেও সুপারভাইজার আসেননি। পরে মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে। মারধরের বিষয়ে আমার নামে যে অভিযোগটি করা হচ্ছে তা সত্য নয়।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বুধবার (৭ জানুয়ারি) ১২:৪৫মিনিটে পুলিশ মিডিয়া গ্রুপ নওগাঁর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সাংবাদিকদের এ তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন পুলিশ জানান, গত ৪ জানুয়ারি সাপাহার সার্কেলের এএসপি এবং একজন বাসচালকের মধ্যে সংঘটিত অপ্রীতিকর ঘটনা সংগঠিত হয় মর্মে ৬ জানুয়ারি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়। সংবাদটি আমার দৃষ্টিতে আসার পরেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) জয়ব্রত পালকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের রিপোর্ট অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।